১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চ পূর্ব বাংলা আইনসভা নির্বাচনে মুসলিম লীগের চরম পরাজয় ঘটে। ৩০৯ আসনের মধ্যে তারা মাত্র ৯টি আসন পায়, যেখানে যুক্তফ্রন্ট জিতে ২২৩টি। ১৯৩৭ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মুসলিম লীগের এই পতন ছিল বাঙালি জনগণের রায়—শোষণ, বৈষম্য ও ব্যর্থ শাসনের বিরুদ্ধে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মুসলিম লীগ সরকার পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিকসহ অনেককে হত্যা করে। এই নির্যাতন জনগণের মনে চরম ক্ষোভের সঞ্চার করে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সরকারের প্রতি ঘৃণা নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়।
পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানির আয়ের বড় অংশ নিজেদের উন্নয়নে ব্যবহার করত। পূর্ব পাকিস্তানে:
এসব কারণে গ্রামীণ জনগণ মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, জনকল্যাণে উদাসীনতা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়।
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল জনগণের মৌলিক দাবির প্রতিফলন:
এই কর্মসূচি গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনসমর্থন লাভ করে।
আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজাম-ই-ইসলামসহ বিরোধী দলগুলো যুক্তফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ হয়। এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শক্তিশালী প্রচারণা চালানো হয়।
ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়। তারা বুঝতে পারে যে, মুসলিম লীগ তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। নির্বাচনে তারা সচেতনভাবে ভোট দেয়।
মুসলিম লীগ প্রচারণায় পশ্চিম পাকিস্তানের সমর্থন ও ধর্মীয় আবেগ উসকে দিতে চায়, কিন্তু জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করে। যুক্তফ্রন্টের স্লোগান—“লাঙ্গল যার, জমি তার”—জনপ্রিয় হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় ছিল শোষণ, বৈষম্য ও ব্যর্থতার ফল। এটি প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকলে কোনো শাসকগোষ্ঠী টিকে থাকতে পারে না। এই পরাজয় বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ প্রশস্ত করে।