তমদ্দুন মজলিস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন। এটি ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে ইসলামী চেতনা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো। কিন্তু এই সংগঠনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলা, যা ভাষা আন্দোলনের সূচনা করে।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের পর পাকিস্তান গঠিত হলে বাঙালিরা তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য সচেতন হয়। তমদ্দুন মজলিসের নামটি আরবি শব্দ 'তমদ্দুন' (নাগরিকতা, সংস্কৃতি) এবং 'মজলিস' (সভা) থেকে এসেছে। প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম ছিলেন একজন তরুণ অধ্যাপক, যিনি ইসলামী আদর্শের সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। সংগঠনটি শুরুতে ছিল কয়েকজন সদস্যের ছোট গ্রুপ, যার মধ্যে ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল মনসুর আহমেদ।
তমদ্দুন মজলিস ভাষা আন্দোলনের প্রথম ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংগঠনটি "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?" নামক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে, যাতে কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ এবং আবুল কাসেমের প্রবন্ধ ছিল। এতে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার যুক্তি দেওয়া হয়।
১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর সংগঠনটি প্রতিবাদ করে। তারা সেমিনার, সভা, মিছিল এবং প্রকাশনার মাধ্যমে আন্দোলনকে গতিশীল করে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে তারা প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। এই সংগঠনের প্রচেষ্টা ছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হতো না।
তমদ্দুন মজলিসের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী আদর্শের আলোকে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলা, কুসংস্কার দূর করা এবং নাগরিকদের মধ্যে ইসলামী চেতনা জাগ্রত করা। সংগঠনটি সভা, সেমিনার, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে কাজ করত। তাদের সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সৈনিক' ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। যদিও এটি ধর্মভিত্তিক, ভাষা আন্দোলনে এর সেক্যুলার ভূমিকা বাঙালি সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
তমদ্দুন মজলিস শুধু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, বরং বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্মদাতা। এর প্রচেষ্টা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। আজও এর চেতনা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির রক্ষায় অনুপ্রেরণা যোগায়। এই সংগঠনের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর।