পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য
ভূমিকা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান ছিল। এই বৈষম্য ছিল শুধু অর্থনৈতিকই নয়, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বিস্তৃত। পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বেশি সুবিধা ভোগ করেছে, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান উপনিবেশিক শোষণের শিকার হয়েছে। এই বৈষম্যই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল কারণ হয়ে ওঠে।
১. জনসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বের বৈষম্য
- পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল মোট পাকিস্তানের ৫৫% (১৯৬১ সালের আদমশুমারি অনুসারে প্রায় ৫.৫ কোটি, পশ্চিমে ৪.২ কোটি)।
- কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদের আধিপত্য ছিল (যেমন: সেনাবাহিনীর ৯০% কর্মকর্তা পশ্চিম থেকে)।
- ফল: অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো পশ্চিমের স্বার্থে নেওয়া হতো।
২. বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও ব্যয়ের বৈষম্য
- পূর্ব পাকিস্তান পাট রপ্তানি থেকে পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ৫০-৭০% আয় করত (১৯৫০-৬০ দশকে গড়ে ৬০%)।
- কিন্তু এই অর্থের বেশিরভাগ (প্রায় ৭০%) পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও আমদানিতে।
- উদাহরণ: ১৯৪৭-১৯৭০ সালে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় ৩১০০ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়।
৩. শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের বৈষম্য
পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পের দ্রুত বিকাশ (করাচি, লাহোর কেন্দ্র), পূর্বে শিল্প সীমিত (চট্টগ্রামে কিছু পাটকল)।
| বিভাগ |
পূর্ব পাকিস্তান |
পশ্চিম পাকিস্তান |
| জনসংখ্যা (% মোট) |
৫৫% |
৪৫% |
| উন্নয়ন ব্যয় (% মোট) |
২৫-৩০% |
৭০-৭৫% |
| শিল্প প্রতিষ্ঠান (% মোট) |
২০-৩০% |
৭০-৮০% |
| প্রতি মাথাপিছু আয় (১৯৬৯-৭০) |
২৭৫ টাকা |
৪৮৫ টাকা |
| বৈদেশিক মুদ্রা আয় (% মোট) |
৫০-৭০% |
৩০-৫০% |
উৎস: পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশন, রেহমান সোবহান
৪. অবকাঠামো ও সামাজিক খাতের বৈষম্য
- পরিবহন: পশ্চিমে রেল, সড়ক ও বিমানবন্দরের ব্যাপক উন্নয়ন; পূর্বে সীমিত।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: পশ্চিমে বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল বেশি; পূর্বে প্রতি মাথাপিছু ব্যয় কম।
- কৃষি: পূর্বে পাটের একচেটিয়া উৎপাদন, কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমের লাভ।
৫. প্রভাব ও ফলাফল
- পূর্ব পাকিস্তানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অসন্তোষ বৃদ্ধি।
- ১৯৬৮-৬৯ সালের গণ-আন্দোলন ও ১৯৭০ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়।
- এই বৈষম্য মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) অন্যতম কারণ।
- অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ছিল "অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ"।
উপসংহার
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল একটি সুপরিকল্পিত শোষণ ব্যবস্থা। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিমের উন্নয়নে ব্যবহৃত হলেও সেখানকার জনগণের জীবনমান উন্নত হয়নি। এই বৈষম্যই বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটায় এবং অবশেষে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—ন্যায়সঙ্গত বণ্টন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।