উত্তরঃ ভূমিকাঃ ১৮৫৭ সালের সিপাহিবিদ্রোহের পর ভারত শাসনের দায়িত্ব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরিয়ে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি মহারানির নামে গ্রহণ করে। এর ফলে ভারতে রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী ভাইসরয় নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। লর্ড এলগিনের পর লর্ড কার্জন ভাইসরয় হিসেবে নিযুক্ত হন। তার শাসনামলে বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল প্রশাসনিক বিভাগ। বিশাল এই বাংলা প্রেসিডেন্সি কার্যকরভাবে শাসন করা একজন গভর্নরের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিকে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেন, যা ইতিহাসে "বঙ্গভঙ্গ" নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও আসাম অঞ্চলকে নিয়ে গঠিত হয় একটি নতুন প্রদেশ—“পূর্ব বাংলা ও আসাম”; যার রাজধানী স্থাপন করা হয় ঢাকায়। অপরদিকে, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যাকে নিয়ে গঠিত হয় অপর অংশ, যার রাজধানী ছিল কলকাতা।
যদিও লর্ড কার্জন এই বিভাজনকে প্রশাসনিক সুবিধার উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করেন, প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য—হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্বল করা। বঙ্গভঙ্গের এই সিদ্ধান্ত তীব্র বিরোধিতা ও আন্দোলনের জন্ম দেয়, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা আবার একত্রিত হয়।
বঙ্গভঙ্গ ভারতের উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ঘটনা। বঙ্গভঙ্গের পূর্বে বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের সর্ববৃহৎ ও জনবহুল প্রদেশ, যার শাসনভার ছিল একজন গভর্নর বা ছোটলাটের উপর ন্যস্ত। বিশাল এই প্রদেশের কার্যকর শাসন পরিচালনা করা একজন গভর্নরের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ছিল।
এই বিষয়টি ১৮৬৭ সালে স্যার উইলিয়াম গ্রে এবং ১৮৭২ সালে স্যার জন ক্যাম্পবেল ঊর্ধ্বতন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা উভয়েই বাংলাকে প্রশাসনিকভাবে ভাগ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিন যাবৎ চলতে থাকা এই আলোচনা বাস্তব রূপ পায় ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আমলে। লর্ড কার্জন পূর্ববঙ্গ সফরের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। লর্ড অ্যান্ড্রো ফ্রেজারের সহযোগিতায় তিনি পূর্ববঙ্গ ও আসামকে একত্র করে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে, ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয় (উৎস: বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯০৫–১৯৭১, ড. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন)।
এই বিভক্তির ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ত্রিপুরা ও আসাম মিলে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয় এবং ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়। অপরদিকে পশ্চিম অংশে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যাকে নিয়ে গঠিত হয় 'পশ্চিম বাংলা' প্রদেশ, যার রাজধানী হয় কলকাতা। ইতিহাসে এই ঘটনাটিই 'বঙ্গভঙ্গ' নামে পরিচিত।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রিটিশ ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। যদিও ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের নামে কার্যকর করা হয়, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তবে এই বিভক্তি মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য কিছুটা আশীর্বাদস্বরূপ প্রমাণিত হয়।