ভারত ছিল একটি বিশাল ভূখণ্ড, যেখানে নানা ধর্ম, জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে একত্রে বসবাস করত। বিভিন্ন শাসকের আমলেও এই বহুধা বৈচিত্র্য রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূচনা ঘটে এবং তা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। এর মূল কারণ ছিল ব্রিটিশদের 'ভাগ করে শাসন করো' নীতি, যার মাধ্যমে তারা শাসনকে টিকিয়ে রাখতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কেবল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক যুক্তির ওপর ভিত্তি করে হয়নি; এটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের এক সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে দমন করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফলে দুটি সম্প্রদায় স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় ভারতে সাম্প্রদায়িকতার চরম রূপ দেখা যায়। বঙ্গভঙ্গ মুসলমানদের কাছে আর্থসামাজিক উন্নতির সুযোগ মনে হলেও, কংগ্রেসপন্থি হিন্দুরা এর তীব্র বিরোধিতা করে একে 'বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ' হিসেবে দেখে। এই বিভাজন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম দাঙ্গার সৃষ্টি করে, বিশেষ করে ১৯০৬-১৯০৭ সালের মধ্যে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলমানরা ও বিপক্ষে হিন্দুরা আন্দোলন শুরু করলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়, যা মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে মুসলমানদের আশা ভঙ্গ হয় এবং হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। এই সাম্প্রদায়িক চেতনার বিষবাষ্প ঘনীভূত হতে থাকে এবং এর ফলস্বরূপ ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়।
ব্রিটিশ শাসনের "ভাগ করো ও শাসন করো" নীতির কারণে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়, যা ভারতে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে। এর ফলস্বরূপ তীব্র দাঙ্গা শুরু হয় এবং সাম্প্রদায়িকতা ক্রমশ বাড়তে থাকে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন এবং ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টি।