পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিবরণ দাও।

অথবা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাঙালিরা কী ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়?
অথবা, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো তুলে ধর।

উত্তর:

ভূমিকা:
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পরিকল্পিতভাবে বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে। বাঙালিদের শ্রম, উৎপাদন ও রপ্তানি আয় থাকলেও অর্থনৈতিক সুবিধা অধিকাংশই চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। নিচে এই বৈষম্যগুলো ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো:

১. পঞ্চবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনায় বৈষম্য:

২. বাজেট ও সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য:

১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বৈষম্য স্বীকার করে একটি ফাইন্যান্স কমিটি গঠন করেন। কমিটি জনসংখ্যার অনুপাতে সম্পদ বণ্টনের সুপারিশ করে, কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

৩. রপ্তানি আয়ে বৈষম্য:

পূর্ব পাকিস্তান ছিল প্রধান পাট উৎপাদনকারী অঞ্চল, যা ছিল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু এই রপ্তানি আয় পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নে ব্যবহার করা হতো, পূর্বাঞ্চলে তেমন কোনো শিল্পায়ন বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেনি।

৪. শিল্প ও অবকাঠামো খাতে বৈষম্য:

পশ্চিম পাকিস্তানে তেল, সিমেন্ট, লৌহ-ইস্পাত, জাহাজ ও বিমানের মতো ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে কোনো বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। বন্দর, রেলপথ, সড়কসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নেও পূর্বাঞ্চল ছিল উপেক্ষিত।

৫. বৈষম্যের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:

বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালিরা ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ১৯৬০-৭০ দশকে স্বাধিকারের দাবি জোরালো হয়। এই অর্থনৈতিক শোষণই ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রেক্ষাপট।

উপসংহার:

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত করে রাখে। উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট, শিল্প, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ—সবকিছুতেই ছিল বৈষম্য। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে বঞ্চনা, ক্ষোভ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই বৈষম্যই এক সময় রূপ নেয় ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে।