প্রশ্নঃ ব্রিটিশ শাসন আমলে সাম্প্রদায়িকতার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
অথবা, ব্রিটিশ শাসন আমলে সাম্প্রদায়িকতার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
অথবা, উপনিবেশিক শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও এর ফলাফল ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা:
ভারত উপমহাদেশ দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের স্থান ছিল। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে যুগের পর যুগ একত্রে বসবাস করত। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সূচনা এই ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরায়। তাদের "Divide and Rule" বা "ভাগ করো ও শাসন করো" নীতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপিত হয়।
সাম্প্রদায়িকতার উৎপত্তির কারণ:
- মুসলমানদের প্রতি অবহেলা: ব্রিটিশরা মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় বলে তাদের সন্দেহের চোখে দেখে এবং অবহেলা করে। ফলে মুসলমানরা প্রশাসন ও শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে।
- হিন্দুদের প্রতি পক্ষপাত: ব্রিটিশরা প্রশাসনিক সহায়তায় হিন্দু সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার দেয়, যারা প্রথম থেকেই তাদের সহযোগিতা করে আসছিল। এতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়।
- ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ভূমি নীতির কারণে মুসলমান জমিদাররা জমি হারান, আর হিন্দু ব্যবসায়ী ও জমিদার শ্রেণি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মুসলমান কৃষকদের উপর শোষণ বাড়ে, যা সাম্প্রদায়িক বিভেদের রূপ নেয়।
- ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার: হিন্দুরা দ্রুত পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে প্রশাসনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। মুসলমানরা ধর্মীয় কারণে এ শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণে অনাগ্রহী ছিল, ফলে তারা পিছিয়ে পড়ে। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়।
সাম্প্রদায়িকতার ক্রমবিকাশ:
- ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস গঠিত হলেও মুসলমানদের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল।
- ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয় — মুসলমানরা পক্ষে, হিন্দুরা বিপক্ষে।
- ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
- ১৯২৮ সালের নেহেরু রিপোর্ট মুসলমানদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
- ১৯২৯ সালে জিন্নাহ ‘চৌদ্দ দফা’ উত্থাপন করেন।
- ১৯৩২ সালের ‘সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ’ সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়ায়।
- ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে সরকার গঠন করে।
- ১৯৪০ সালে ‘লাহোর প্রস্তাব’-এ পৃথক রাষ্ট্রের দাবি ওঠে।
- ১৯৪৬ সালের কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গা চূড়ান্ত উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
ফলাফল:
ব্রিটিশদের সাম্প্রদায়িক উসকানি ও নীতির ফলে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যকার বিভেদ গভীর হয়। এই সাম্প্রদায়িকতার চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তান গঠিত হয়।
উপসংহার:
ভারতের সাম্প্রদায়িকতার পেছনে ধর্ম নয়, বরং ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শাসননীতিই মুখ্য ভূমিকা রাখে। তাদের "Divide and Rule" নীতির ফাঁদে পড়ে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যকার সম্প্রীতি নষ্ট হয়, যার পরিণতি ছিল বিভক্ত ভারত। এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।