১। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের ভূগোলিক বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাসের উপর প্রভাব বর্ণনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূপ্রকৃতির বর্ণনা দাও।
অথবা, বাংলাদেশের অবস্থান ও ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা

বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ রাষ্ট্র। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা—এ তিন মহানদীর মিলিত পলি জমে গঠিত এ দেশের ভূ-প্রকৃতি। মাত্র ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ ভূখণ্ডে রয়েছে সমতল ভূমি, পাহাড়, হাওর, বিল, নদী, সাগর উপকূল ও ম্যানগ্রোভ বনের অপরূপ সমন্বয়। ভূ-গঠনের সময় ও উচ্চতার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: টারশিয়ারি যুগের পাহাড়, প্লাইস্টোসিন সোপান এবং সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি। এ বৈচিত্র্যই আমাদের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিম্নে ১২টি মুখ্য বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে আলোচিত হলো।

বাংলাদেশের প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য

১।
বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদত্রয়ের পলি জমে গঠিত বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ। প্রতি বছর প্রায় ১.৫ বিলিয়ন টন পলি এনে নদীমোহনায় জমা হয়, যার ফলে নতুন চর সৃষ্টি হয়। এ পলি মাটিকে অত্যন্ত উর্বর করে তোলে, যা ধান, পাট ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে সহায়ক।
২।
নিম্ন উচ্চতার সমভূমি দেশের প্রায় ৮০% ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটারের নিচে অবস্থিত। এ কারণে বর্ষাকালে স্বাভাবিক বন্যা হয়, যা পলি জমিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। তবে অতিবৃষ্টি বা ঝড়ের কারণে বিপর্যয়কর বন্যাও দেখা যায়।
৩।
বিস্তৃর্ণ প্লাবনভূমি পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদীর অববাহিকায় প্রায় ৫৭,০০০ বর্গকিলোমিটার প্লাবনভূমি রয়েছে। প্রতি বছর পলি জমে এ অঞ্চলের মাটি উর্বর হয়। এটি বাংলাদেশের ধান ও পাট উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র।
৪।
টারশিয়ারি যুগের পাহাড়শ্রেণি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও সিলেট অঞ্চলে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় রয়েছে, যা দেশের মোট ভূমির ১২%। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কেওক্রাডং (১,২৩০ মিটার)। এখানে চা বাগান, বনজ সম্পদ ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
৫।
প্লাইস্টোসিন সোপান বা টেরাস বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর গড় ও লালমাই পাহাড় প্লাইস্টোসিন যুগের উঁচু টিলা। লাল মাটির এ অঞ্চলে আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারসের বাগান রয়েছে। বন্যার হাত থেকে এ অঞ্চল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
৬।
হাওর অববাহিকা সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে প্রায় ২৫টি হাওর রয়েছে। বর্ষাকালে এগুলো বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, শীতকালে ধানের ক্ষেতে রূপান্তরিত হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত।
৭।
সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বন ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাস। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সুনামি থেকে উপকূল রক্ষা করে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য।
৮।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও প্রবাল দ্বীপ ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বেলাভূমি। সেন্টমার্টিন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এ অঞ্চল পর্যটন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
৯।
চর ও দ্বীপসমূহ নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা প্রভৃতি দ্বীপ ও চর প্রতি বছর নদীভাঙন ও পলি জমে নতুনভাবে গঠিত হয়। এগুলো মৎস্য সম্পদ ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য।
১০।
নদীখাত ও বদ্বীপ বাংলাদেশে ৭০০টির বেশি নদী ও ২৪,০০০ কিলোমিটার জলপথ রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর বিনুনি গতিপথ ভূ-প্রকৃতির গতিশীলতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মেঘনা মোহনায় বিশাল বদ্বীপ গঠিত।
১১।
জলাভূমি ও বিল চলন বিল, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, বাঙালি বিল প্রভৃতি জলাভূমি শীতকালে লক্ষ লক্ষ অতিথি পাখির আগমনস্থল। এগুলো জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
১২।
ভূ-ক্ষয় ও অবক্ষেপণ প্রক্রিয়া উজান থেকে আসা বিপুল পলি নদীগর্ভে জমে নদীর গভীরতা কমায়। ফলে নদী গতিপথ পরিবর্তন করে। উদাহরণ: ১৭৮৭ সালে যমুনা নদী পশ্চিম দিকে সরে যায়। এ প্রক্রিয়া ভূ-প্রকৃতির গতিশীলতা প্রকাশ করে।

উপসংহার

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল। এর উর্বর সমভূমি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা দেয়, পাহাড়-হাওর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেয়, সুন্দরবন জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও মানুষের অপরিকল্পিত কার্যকলাপ এ সৌন্দর্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই আমাদের কর্তব্য—নদী সংরক্ষণ, বনায়ন, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সচেতনতার মাধ্যমে এ সোনার বাংলাকে চিরসবুজ ও সমৃদ্ধ রাখা।